অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম পড়ে যাওয়ায় সাম্প্রতিক বছরে মুনাফার টানা পতন দেখেছে জ্বালানি তেল কোম্পানিগুলো। চলতি বছরও সেই ধারা অব্যাহত থাকার আভাস দেখা যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে অয়েল জায়ান্টগুলো কভিড মহামারী-পরবর্তী সবচেয়ে কঠিন বছরের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে, যার প্রভাব পড়েছে বাজারে। গতকাল থেকে বৃহৎ কোম্পানিগুলো চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকের (জানুয়ারি-মার্চ) আর্থিক ফলাফল প্রকাশ শুরু করেছে। যদিও এর আগেই বিনিয়োগকারীদের আস্থায় সংকট তৈরি হয়েছে।
এফটির সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুসারে, ২০২৫ সালে টানা তৃতীয় বছরের মতো অয়েল জায়ান্টগুলোর মুনাফায় পতনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। ২০২২ সালে রাশিয়া ইউক্রেন আক্রমণ করলে এ খাতে মুনাফা বাড়তে থাকে, কিন্তু এখন এর বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে। পশ্চিমা বিশ্বের পাঁচটি প্রধান জ্বালানি তেল কোম্পানি এক্সনমবিল, শেল, টোটালএনার্জিস, শেভরন ও বিপি সমন্বিত নিট আয় ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে প্রায় ৯ হাজার কোটি ডলার কমে গেছে।
সম্প্রতি পেট্রোলিয়াম রফতানিকারক দেশগুলোর সংস্থা ওপেক জ্বালানি তেল সরবরাহ বাড়িয়ে দিয়েছে। আবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতির কারণে সৃষ্ট বাণিজ্য উত্তেজনা বিনিয়োগকারীদের মনোভাব নাড়া দিয়েছে। সব মিলিয়ে সর্বশেষ সপ্তাহগুলোয় শিল্প খাতের ওপর চাপ আরো বেড়েছে। চলতি মাসে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম কিছু সময়ের জন্য ব্যারেলপ্রতি ৬০ ডলারের নিচে নেমে যায়। এমনকি কিছু বিশ্লেষকের পূর্বাভাস অনুসারে, বছরের দ্বিতীয়ার্ধে (জুলাই-ডিসেম্বর) জ্বালানি তেলের দাম ২০২৪ সালের গড় ৮১ ডলারের তুলনায় এক-পঞ্চমাংশেরও বেশি কমে যেতে পারে।
বিনিয়োগকারীরা এখন ভাবছেন, বড় জ্বালানি তেল কোম্পানির খরচ নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা ও আর্থিক ভিত্তি (ব্যালান্স শিট) যথেষ্ট শক্তিশালী কিনা যাতে তারা আগের মতোই উচ্চ লভ্যাংশ এবং শেয়ার পুনঃক্রয়ের প্রতিশ্রুতি বজায় রাখতে পারে। কিন্তু এখন মুনাফা কমে যাওয়ায় সেই প্রতিশ্রুতি কতটা টিকবে তা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা দেখা দিচ্ছে।
আর্থিক প্রতিষ্ঠান আরবিসি ক্যাপিটাল মার্কেটসের বিশ্লেষক বিরাজ বরখতরিয়া বলেন, ‘কোন কোম্পানি আগে কাটছাঁট শুরু করবে—আমরা বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে এমন প্রশ্ন পাচ্ছি। বর্তমান অনিশ্চিত পরিবেশে তারা বিনিয়োগ আস্থা খুঁজছেন।’
গত বৃহস্পতিবার প্রথম প্রান্তিকের আর্থিক ফল প্রকাশ করে ইতালীয় জ্বালানি তেল কোম্পানি এনি। সেখানে তারা বছরে অন্তত ৫ হাজার কোটি ডলার ব্যয় কমানোর ঘোষণা দিয়েছে। এছাড়া বলেছে, ব্যারেলপ্রতি জ্বালানি তেলের দাম ৬৫ ডলার থাকলে কোম্পানির নগদপ্রবাহ প্রত্যাশার তুলনায় ২ হাজার কোটি ডলার বা ১৫ শতাংশ কম হবে।
এনি জানিয়েছে, তারা শেয়ারহোল্ডারদের জন্য অর্থ ফেরত দেয়ার প্রতিশ্রুতি বজায় রাখবে। এইচএসবিসি বিশ্লেষকরা বলেছেন, এ কৌশল এনির প্রতিদ্বন্দ্বীদের জন্য ‘অনুসরণযোগ্য মডেল’, তবে এ ধরনের প্রতিশ্রুতি দেয়ার মতো শক্তিশালী আর্থিক সব কোম্পানির নেই।
জ্বালানি তেলের দামের পতনের কারণে খাতজুড়ে বিনিয়োগ কমে গেছে। গবেষণা ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠান উড ম্যাকেঞ্জির জ্বালানিবিষয়ক বিশ্লেষক ফ্রেজার ম্যাকি বলেন, ‘আমরা ধারণা করছি, ২০২০ সালের পর এই প্রথমবার বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেল ও গ্যাস বিকাশে বার্ষিক ব্যয় কমবে।’
বেশির ভাগ বিশ্লেষক শীর্ষ জ্বালানি তেল কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে একটি দুর্বল প্রান্তিক প্রত্যাশা করছেন। তবে দামের সবচেয়ে বড় পতনগুলো ঘটেছে প্রান্তিকের শেষ দিকে অর্থাৎ মার্চে। তাই বিনিয়োগকারীরা মূলত কোম্পানির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা জানতে বেশি আগ্রহী।
ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোর মধ্যে শেল সবচেয়ে ভালোভাবে মন্দার জন্য প্রস্তুত বলে মনে হচ্ছে। গত মাসে কোম্পানির প্রধান নির্বাহী ওয়ায়েল সাওয়ান প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, শেলের নগদপ্রবাহের অর্ধেক অংশ বিনিয়োগকারীদের ফিরিয়ে দেয়া হবে। তিনি আরো জানান, জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৫০ ডলারে নেমে গেলেও কোম্পানি শেয়ার পুনঃক্রয় চালিয়ে যেতে পারবে এবং এমনকি ৪০ ডলারেও লভ্যাংশ বজায় থাকবে।
অন্যদিকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে বিপি। কারণ তারা মুনাফা বাড়ানোর জন্য অ্যাক্টিভিস্ট হেজ ফান্ড এলিয়ট ম্যানেজমেন্টের চাপে রয়েছে। কোম্পানিটি ব্যারেলপ্রতি ৭১ ডলার ৫০ সেন্ট মূল্যের ওপর ভিত্তি করে ৩০-৪০ শতাংশ নগদপ্রবাহ শেয়ার পুনঃক্রয়ের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের ফেরত দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। বিপি ফেব্রুয়ারিতে বলেছিল, জ্বালানি তেলের দামে ১ ডলার কমলে প্রায় ৩৪ কোটি ডলার মুনাফা হ্রাস পাবে।
যুক্তরাষ্ট্রে এক্সনমবিল ও শেভরনের পরিস্থিতি ভিন্ন। মার্কিন বিনিয়োগ ব্যাংক টিডি কাউয়েনের বিশ্লেষক জেসন গ্যাবেলম্যানের মতে, এক্সনের শক্তিশালী সম্পদভিত্তি রয়েছে, যা ২০২৬ সাল পর্যন্ত বিনিয়োগকারীদের রিটার্ন বজায় রাখতে সহায়তা করবে।
শেভরন প্রসঙ্গে নোটে টিডি কাউয়েন বলেন, ‘শেভরন আগে বলেছিল জ্বালানি তেলের দাম ৬০-৮৫ ডলারের মধ্যে হলে তাদের শেয়ার পুনঃক্রয় হবে ১-২ হাজার কোটি ডলারের মধ্যে। এখন যদি দাম নিচের দিকে যায়, তাহলে সেই পুনঃক্রয় সীমা কমে যেতে পারে।’
বড় কোম্পানিগুলোর বাইরেও ছোট জ্বালানি তেল উত্তোলনকারী ও তেলক্ষেত্র পরিষেবা দেয়া প্রতিষ্ঠানগুলোও সতর্কবার্তা দিচ্ছে। তারা বলছে, জ্বালানি তেলের দাম কম থাকলে পরিস্থিতি আরো কঠিন হবে। গত সপ্তাহে পশ্চিমা বিশ্বের তিনটি বড় জ্বালানি তেল পরিষেবা কোম্পানি বেকার হিউজ, হ্যালিবার্টন ও এসএলবি দুর্বল বাজারের আশঙ্কা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।